প্রতীকী ছবি

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ থামার নাম নেই। তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই প্রাদুর্ভাবে প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও এখনও ফাঁকা নেই হাম ওয়ার্ডের শয্যা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসার জন্য ছুটে আসছেন রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে শতভাগেরও বেশি কভারেজ অর্জনের দাবি থাকলেও আক্রান্তদের মধ্যে এত টিকা না পাওয়া মানুষ আসছে কোথা থেকে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে হামের টিকা কভারেজ শতভাগেরও বেশি। সাধারণত এই হিসাব করা হয় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা বিবেচনায়। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে এখনও এমন অনেক শিশু ও মানুষ রয়েছে, যারা কখনও হামের টিকা নেয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কাগজে-কলমে অর্জিত সাফল্য কি বাস্তবে সবার কাছে পৌঁছাতে পেরেছে?

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের এক অভিভাবকরা জানান, কেউ জন্মের পর নির্ধারিত বয়স না হওয়ায় টিকা পায় না। আরেক অভিভাবক জানান, তারাও টিকা পাননি। এমন অনেক অভিভাবক জানান, র্যাশ জ্বর আর ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসছে শিশুদের।

শিশু বিশেষজ্ঞরাও বলছেন নানা কারণে অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের বাইরে থেকে যায়। কেউ পরিবারের অজ্ঞতার কারণে বাদ পড়ে, আবার কেউ বসবাস করে এমন এলাকায় যেখানে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন। ফলে জাতীয় গড় যতই আশাব্যঞ্জক হোক, কিছু শিশুর বাদ পড়ে যাওয়াই পরবর্তীতে বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাতকারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাক হোসেন জানান, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু উচ্চ কভারেজ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো। কারণ একজন টিকা না পাওয়া শিশুও সংক্রমণের শৃঙ্খল তৈরি করতে পারে। করোনা মহামারির সময় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় এমন শিশুদের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এ কারণে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘অ্যাকটিভ সার্চ’ বা সক্রিয় অনুসন্ধানে। অর্থাৎ বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করা এবং দ্রুত তাদের টিকার আওতায় আনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের রোগী দেখেই বোঝা যাচ্ছে শুধু নিয়মিত কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলে হবে না, বাদ পড়া জনগোষ্ঠীকে খুঁজে বের করতেই হবে।

হামের টিকার পাশাপাশি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন-এ ক্যাপসুলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আগামী ২৮ জুন দেশব্যাপী পরিচালিত হতে যাচ্ছে ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

হামের বর্তমান পরিস্থিতি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে টিকার কভারেজের সংখ্যা যতই বড় হোক, একজন শিশুও যদি টিকার বাইরে থাকে, তবে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই এখন প্রয়োজন শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্য নয়, প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.