শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, পুষ্টি ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করাই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার। একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে হলে প্রথম বিনিয়োগটা করতে হয় শৈশবেই। নতুন সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শিশু ও কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা ভয় নয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে।
একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ ও ক্যাম্পাসের ভেতরেই। সেখানে যদি অস্থিরতা বাসা বাঁধে, তবে উন্নয়নের সব সূচকই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের তীব্র উত্থান, করোনা-পরবর্তী শিক্ষাগত গ্যাপ, আন্দোলন সংস্কৃতির বিস্তার এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় ঘন ঘন পরিবর্তন। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে তৈরি হয়েছে জটিল এক বাস্তবতা। শিক্ষা ও শৃঙ্খলার এই টানাপোড়েন সামাল দেয়া এখন নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তুচ্ছ বিরোধ থেকে শুরু করে মারামারি, ছিনতাই অপরাধের খবরে যুক্ত হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নাম। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন চলমমান আনন্দোলন এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর আসক্তি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব অনেককে ঠেলে দিয়েছে ভার্চুয়াল ও বাস্তব দুই জগতের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবের দিকে।
করোনা সময়ের সেই গ্যাপ এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যভিত্তিক দক্ষতায় পিছিয়ে পড়েছে, কারও কারও মধ্যে তৈরি হয়েছে আচরণগত সমস্যা। স্কুলে ফেরার পর দেখা গেছে শুধু পাঠ্যসূচি নয়, শৃঙ্খলাবোধ ও সহনশীলতাতেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি হলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল।
অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষাঙ্গণে এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাবের অভিযোগও সামনে এসেছে। কথায় কথায় আন্দোলনের ডাক, শিক্ষক লাঞ্চনা, মারমুখী আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচার এবং সামান্য ইস্যুতেই ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, অবরোধের ডাক।শিক্ষাব্যবস্থাকে বারবার অচল করে দিচ্ছে। আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার তবে একাডেমিক ক্যালেন্ডার ভেঙে পড়লে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরই। বারবার সেশনজট তৈরি হলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
ক্যাম্পাস রাজনীতি বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন নয়। কিন্তু যখন তা মতপ্রকাশের চর্চা থেকে সরে গিয়ে দখল, সহিংসতা বা দলীয় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রূপ নেয় তখন শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে গবেষণা ও মেধা বিকাশও থমকে যায়। এতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিক্ষানীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিছু দিন পরপর সিলেবাস বা মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলে গেলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে শিক্ষাব্যবস্থায় আস্থা কমে যায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পাইলটিং না হলে তার চাপ পড়ে শিক্ষার্থীর ওপরই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা বাণিজ্যের অভিযোগ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাড়তি টিউশন ফি, কোচিং নির্ভরতা, অতিরিক্ত বই ও প্রযুক্তি ব্যয় সব মিলিয়ে বেড়েছে শিক্ষার খরচ। মধ্যবিত্ত পরিবারে তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ, আর নিম্নআয়ের পরিবারে বাড়ছে ঝরে পড়ার আশঙ্কা। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানের ব্যবধান, ইংরেজি মাধ্যম ও বাংলা মাধ্যমের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য। এসব বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অসমতা বাড়াচ্ছে।
এই বহুমাত্রিক সংকটে নতুন সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগ নয় বরং প্রতিরোধমূলক ও মানবিক উদ্যোগ নেওয়া। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কমিউনিটি পুলিশিং, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণে বিশেষ সহায়ক কর্মসূচি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষানীতিতে ধারাবাহিকতা, ব্যয়ের যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং বৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ এসবই হতে পারে আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ। কারণ শ্রেণিকক্ষ যদি স্থিতিশীল না থাকে, তবে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও টেকসই হয় না।
রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত ভিত গড়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে। সেখানে যদি অস্থিরতা, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা জায়গা করে নেয়, তবে ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মুখে পড়ে। নতুন সরকারের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষাকে রাজনীতির সংঘাত থেকে দূরে রেখে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। শিশুকে রক্ষা করলেই রক্ষা পাবে শিক্ষার ভিত্তি, আর শিক্ষার ভিত্তি শক্ত হলেই টেকসই হবে দেশের অগ্রযাত্রা।
লেখক: রিমু সিদ্দিক
নারী, শিশু উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক

Leave a Reply