শিশুদের শৈশব হওয়ার কথা আনন্দ, খেলা আর নতুন কিছু জানার স্বতঃস্ফূর্ত সময়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। এখন শিশুর দিন শুরু হয় বই, কোচিং আর নানা ধরনের প্রস্তুতির চাপে। ভালো ফল করতে হবে, অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে হবে। এই অদৃশ্য প্রত্যাশা ছোট বয়সেই তাদের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে বড় হওয়ার দায়িত্ব। ফলে অজান্তেই অনেক শিশু জড়িয়ে পড়ছে এক নীরব প্রতিযোগিতায়, যেখানে শৈশবের সরলতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ সব জায়গা থেকেই শিশুদের প্রতি প্রত্যাশা বেড়েছে। অনেক অভিভাবক চান তাদের সন্তান ছোট বয়স থেকেই সেরা হোক। তাই নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি কোচিং, ভাষা শেখা, নাচ-গান, আঁকা কিংবা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয় অনেক শিশুকে। এর ফলে শিশুদের সময়সূচি হয়ে ওঠে বড়দের মতো ব্যস্ত। স্কুল শেষে কোচিং, তারপর বাড়ির কাজ, আবার নতুন কিছু শেখার ক্লাস। এই চক্রে খেলাধুলা বা অবসরের সময় প্রায়ই কমে যায়। অনেক শিশু নিজের পছন্দের কাজ করার সুযোগও পায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় শিশুদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই চাপ নীরব থাকে। শিশুরা অনেক সময় বড়দের হতাশ করতে চায় না বলে নিজের কষ্ট বা অস্বস্তির কথা প্রকাশ করে না। ফলে ভেতরে ভেতরে তারা উদ্বেগ, ভয় বা আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভুগতে পারে।
শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি শিশুর শেখার ও বেড়ে ওঠার নিজস্ব গতি থাকে। কারও আগ্রহ খেলাধুলায়, কারও শিল্পে, আবার কেউ পড়াশোনায় ভালো করে। কিন্তু সবাইকে একই মাপকাঠিতে মাপার প্রবণতা শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এখন শিশুদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের শুধু ফলাফল দিয়ে বিচার না করে তাদের অনুভূতি, আগ্রহ ও স্বাভাবিক বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। শিশু যেন নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, ভুল করলে যেন তাকে বুঝানো হয়। এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে খেলাধুলা, বিশ্রাম এবং সৃজনশীল কাজের জন্য সময় রাখা শিশুর সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও মূল্যবান সময়। এই সময়টিকে যদি অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও প্রত্যাশার চাপে ভারী করে তোলা হয়, তবে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই শিশুদের বড় করার তাড়াহুড়োর বদলে তাদের শৈশবকে উপভোগ করার সুযোগ করে দেওয়া জরুরি। কারণ আজকের আনন্দময় শৈশবই গড়ে তোলে আগামী দিনের সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক মানুষ।

Leave a Reply