পাঁচ মাসে নির্যাতনের শিকার ১০৩৫ নারী-শিশু

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে নারী ও ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে শিশুদের প্রতি সহিংসতার চিত্র আবারও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য এবং নাগরিক সংলাপে উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ জানুয়ারি থেকে মে মাসের এ সময়ে মোট ১০৩৫ জন নারী ও মেয়ে শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, হত্যাকাণ্ড এবং আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনাও, যা নারী ও শিশু নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ২৫০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬৬ জন মেয়ে শিশু এবং ৭২ জন নারী। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৫ জন, এর মধ্যে ৩১ জন মেয়ে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে, যার মধ্যে ১২ জন মেয়ে শিশু রয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ৫৩ জন, যার মধ্যে ৪৩ জনই মেয়ে শিশু। বিভিন্ন কারণে হত্যার শিকার হয়েছেন ২৩৭ জন, যার মধ্যে ৬৩ জন মেয়ে শিশু। এছাড়া আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৬০টি, যার মধ্যে ২০ জন মেয়ে শিশু রয়েছে।এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে “নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও” শীর্ষক নাগরিক সংলাপে। শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে এর আয়োজন করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের সাম্প্রতিক প্রবণতা, কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সংলাপে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক পর্যায়ে স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং তাদের উৎসাহিত করার জন্য পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তিনি মনে করেন, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে পারলে সহিংসতা কমানো সম্ভব।

এছাড়া সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনা গণমাধ্যমে আলোচনায় আসার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঘটনা আড়ালে চলে যায়। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে “জিরো টলারেন্স” নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

সংলাপে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ ও নারী-শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইনগত কাঠামোর কোনো ঘাটতি নেই, মূল সমস্যা হচ্ছে এর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক মানসিকতা। নারী ও শিশু সুরক্ষায় শুধু সরকার নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব হলো নারী ও শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কারণ দেশের বড় অংশই এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যেও উঠে এসেছে সহিংসতার নতুন মাত্রা। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর বা অনলাইনভিত্তিক সহিংসতা নারীদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ডিসেম্বর ২০২৪ সালে প্রকাশিত UNFPA-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়ে শিশুরা প্রথমবারের মতো সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি এই ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী ভুক্তভোগী কোনো আইনি ব্যবস্থা নেন না এবং অনেকেই পরিবারকেও বিষয়টি জানান না।

এছাড়া বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে ধর্ষণের মোট ৫৬৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে শিশু ও কিশোরীর সংখ্যা ৪১৬টি। ১৭৯টি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ১০৪টি ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩১ জনকে, যার মধ্যে ১৮ জন মেয়ে শিশু ও কিশোরী রয়েছে। সব মিলিয়ে এই পরিসংখ্যানগুলো নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার এক ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। যেখানে আইন, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জোরালোভাবে সামনে আসে।

রিপোর্ট: রিমু সিদ্দিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.