শিশু নির্যাতন: বিচারই শেষ কথা নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিরোধ

কখনো বাবা-মাকে নিঃস্ব করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে আদরের সন্তানের প্রাণ, আবার কখনো বিকৃত লালসার শিকার হতে হচ্ছে ছোট্ট সোনামণিদের। যে ঘরে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, অনেক সময় সেই ঘরই হয়ে উঠছে ভয়, সহিংসতা ও নির্যাতনের জায়গা।

প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা কিংবা হত্যার ঘটনা। কোনো একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সবাই। শুরু হয় প্রতিবাদ, দাবি ওঠে বিচারের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আলোচনা স্তিমিত হয়ে যায়। সামনে আসে নতুন আরেকটি ঘটনা, আর আগের ঘটনার বিচার ও প্রতিরোধের প্রশ্ন চাপা পড়ে যায় জনমতের আড়ালে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মোট ১ হাজার ৩৫ জন নারী ও মেয়ে শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৫০ জন। তাদের মধ্যে ১৬৬ জনই মেয়ে শিশু এবং ৭২ জন নারী। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৫ জন, যার মধ্যে ৩১ জন মেয়ে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে, যার মধ্যে ১২ জনই মেয়ে শিশু। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ৫৩ জন, যার মধ্যে ৪৩ জন মেয়ে শিশু। বিভিন্ন কারণে হত্যার শিকার হয়েছেন ২৩৭ জন, যার মধ্যে ৬৩ জন মেয়ে শিশু। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনজন কন্যাশিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার সুশাসন বিষয়ক পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, শিশু নির্যাতন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা উদ্বেগজনক বললেও কম বলা হয়। তার ভাষায়, রাষ্ট্র যতদিন প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারবে, ততদিন পরিবার ও সমাজকেই বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। একইসঙ্গে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এমন অপরাধ করার আগে অপরাধীরা বারবার ভাববে।

শুধু নির্যাতনের সংখ্যা নয়, বিচারপ্রাপ্তির চিত্রও উদ্বেগের। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে শিশু নির্যাতনের ১৫২টি ঘটনার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৪৭টির। আলোচিত ঘটনার পর প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে, তদন্ত শুরু হয়, গ্রেফতারও হয় অভিযুক্তরা। কিন্তু বিচার শেষ হওয়া এবং রায় কার্যকরের বাস্তবতা নিয়ে থেকেই যায় প্রশ্ন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান মনে করেন, বিচারকের সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে অনেক মামলার নিষ্পত্তি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং অপরাধীদের মধ্যেও ভয় তৈরি হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়। বরং আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিবারের বিশ্বস্ত পরিচিত মানুষই অনেক সময় নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত থাকে। একইসঙ্গে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা নেই। অনেক শিশুই জানে না কোন আচরণ অনিরাপদ, কোথায় অভিযোগ করতে হবে কিংবা বিপদের সময় কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, কোনো মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না। তাই ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে মূল্যবোধ, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অপরাধ ঘটার পর শাস্তির পাশাপাশি অপরাধ জন্ম নেওয়ার কারণগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, বিচার কখনোই প্রতিরোধের বিকল্প নয়। পরিবার থেকেই ছেলে শিশুকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। একইসঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ, সেমিনার এবং শিক্ষাক্রমে বিষয়ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি জরুরি। গণমাধ্যমেও বছরজুড়ে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যেতে হবে।

বিচার হয়তো একজন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধই পারে একটি শিশুকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার আগেই রক্ষা করতে। তাই বিশেষজ্ঞরা স্কুলভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা, ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ বিষয়ে সচেতনতা, অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

একটি শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তাই শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্ষণিকের ভাইরাল ক্ষোভ নয়, প্রয়োজন বছরজুড়ে কার্যকর প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ।

রিপোর্ট: রিমু সিদ্দিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.