শৈশব: উৎসব বনাম সিলেবাস

একসময় শৈশব মানেই ছিল উৎসবের মতো আনন্দময় সময়। বছরে তিনটি পরীক্ষা, বাকিটা সময় খেলাধুলা, গল্প আর আত্মীয়দের সঙ্গে কাটানো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় প্রাইমারি পর্যায়ের শিশুরা যেন সিলেবাস আর পরীক্ষার চাপে আটকে পড়েছে। ক্লাস টেস্ট, ইনকোর্স, সাপ্তাহিক-মাসিক পরীক্ষা, ১ম সাময়িক, ২য় সাময়িক, ফাইনাল এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মডেল টেস্ট, মৌখিক পরীক্ষা, প্রজেক্ট ও হ্যান্ডরাইটিং টেস্ট। ছোট্ট বয়সেই এত মূল্যায়নের ভিড়ে শিশুদের শৈশব আটকে গেছে সিলেবাসে।

৯০ দশকের শৈশবের সঙ্গে বর্তমান সময়ের শিশুদের জীবনের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। আগে বছরে তিনটি বড় পরীক্ষা থাকত। পরীক্ষার বাইরে সময় কাটতো মাঠে, বন্ধুদের সঙ্গে, কিংবা নানা-দাদার বাড়িতে। গরমের ছুটি বা ঈদের ছুটি মানেই ছিল আনন্দের উৎসব। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে বেশিরভাগ স্কুলে নিয়মিত হোমওয়ার্ক, ক্লাস টেস্ট , ইনকোর্স বা কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট, সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাচাই করা হচ্ছে। এর বাইরে ১ম সাময়িক, ২য় সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষার মতো বড় মূল্যায়ন তো রয়েছেই। অনেক স্কুলে আবার ফাইনালের আগে মডেল টেস্ট নেওয়া হয়, সঙ্গে থাকে মৌখিক (ভাইভা), প্রজেক্ট ও অ্যাসাইনমেন্ট। ফলে শিশুরা সবসময়ই আটকে থাকে পড়াশোনার চাপের মধ্যেই।

রাজধানীর এক অভিভাবক জানান, আমাদের সময় পড়ার চাপ কম ছিল। এখন আমার সন্তানকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পড়তে হয়। স্কুল, কোচিং, টিউটর সব মিলিয়ে ওর নিজের জন্য সময়ই থাকে না। অন্যদিকে, একটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী বলে, স্কুল থেকে এসে কোচিংয়ে যেতে হয়, তারপর বাসায় স্যার আসে। খেলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সময় পাই না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট বয়সে অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, খেলা ও অবসর সময় শিশুদের সৃজনশীলতা, সামাজিক দক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় সেই জায়গাটা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

শুধু পড়াশোনার চাপই নয়, পারিবারিক ও সামাজিক আনন্দ থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে শিশুরা। আগে ছুটির দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, আত্মীয়দের বাড়িতে সময় কাটানো ছিল স্বাভাবিক বিষয়। এখন ছুটির দিন মানেই অতিরিক্ত ক্লাস বা হোমওয়ার্ক। ফলে শিশুদের জীবনে আনন্দের জায়গা ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এছাড়া, শিশুদের এতো শ্রম দেয়ার ফলে বেড়েছে অভিভাবকদের প্রত্যাশাও। এতে নিয়মিতই চাপে থাকছে শিশুরা। অনেকেই চান তাদের সন্তান অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকুক। শিক্ষার্থীদের পড়ার চাপে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয় চাপে থাকেন অভিভাবকরাও। ফলে অল্প বয়সেই শিশুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বাড়তি পড়াশোনা ও প্রতিযোগিতা। এতে শিশুরা অনেক সময় ক্লান্ত, বিরক্ত ও পড়াশোনায় অমনোযোগী বা অনিহাসহ মানসিকভাবে চাপে থাকে।

শৈশব কখনোই শুধু সিলেবাস আর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। এটি এমন একটি সময়, যেখানে শেখার পাশাপাশি থাকা উচিত আনন্দ, স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ। ৯০ দশকের সেই উৎসবমুখর শৈশব হয়তো পুরোপুরি ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কিছুটা ভারসাম্য আনা জরুরি।

শুধু জীবনযাত্রা নয়, এই পরিবর্তন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলছে। ৯০ দশকের শিশুরা নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা করায় শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয় ছিল। তাদের দৈহিক সক্ষমতা, সহনশীলতা ও ফিটনেস তুলনামূলক ভালো ছিল। বর্তমানে শিশুদের বেশিরভাগ সময় কাটে ঘরের ভেতর, বই বা স্ক্রিনের সামনে। ফলে শারীরিক কার্যক্রম কমে যাচ্ছে, বাড়ছে ক্লান্তি ও স্থবিরতা। মানসিক দিক থেকেও পার্থক্য স্পষ্ট। আগে পড়াশোনার চাপ সীমিত থাকায় শিশুরা তুলনামূলক স্বস্তিতে বড় হতো। এখন নিয়মিত পরীক্ষা ও ভালো ফলাফলের চাপ শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, ভয় ও মানসিক চাপ তৈরি করছে। অনেক শিশু পরীক্ষার নাম শুনেই ভীত হয়ে পড়ে, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে সফলতার সংজ্ঞাতেও এসেছে পরিবর্তন। ৯০ দশকে সফলতা মানে ছিল স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা শেষ করা ও জীবনে স্থিতিশীল হওয়া। বর্তমানে সফলতা অনেকটাই নির্ভর করছে ছোট বয়স থেকেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার ওপর। ফলে শিশুরা অল্প বয়সেই প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতায় ঢুকে পড়ছে। এতে কিছু শিশু ভালো করছে ঠিকই, কিন্তু অনেকেই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে করে আমরা আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে তাদের শৈশবটাই হারিয়ে ফেলছি।

লেখক: রিমু সিদ্দিক
নারী, শিশু উন্নয়ন ও গণমাধ্যম কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.