“পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন” শব্দটা কি আমরা জানি?

ছিলেন প্রাণবন্ত এক তরুণী মা। বাইরে থেকে স্বাভাবিক, ভিতরে ভীষণ একা। নিজের ১৬ মাসের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে চলে গেলেন চিরতরে আফরোজা। রেখে গেলেন এক গভীর প্রশ্ন, “পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন” শব্দটা কি আমরা জানি?

ফটিকছড়ির শান্ত একটি গ্রামে সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। কিন্তু হঠাৎ ঘরে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত আফরোজা, আর বিছানায় পড়ে থাকা তার ছোট্ট মেয়ের নিথর দেহ। এমন দৃশ্য দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যান পরিবার প্রতিবেশীরা। ২৯ অক্টোবর বুধবার দুপুর দুইটার দিকে উপজেলার সদরের বিবিরহাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশের ধারণা, ১৬ মাসের শিশুসন্তানকে শ্বাস রোধ করে হত্যার পর ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছেন গৃহবধূ আফরোজা আফরিন (২৫)। তিনি ফটিকছড়ি পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের স্ত্রী। আনোয়ারুল একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত বলে জানিয়েছে পরিবার।

পরিবার বলছে, সন্তান জন্মের পর থেকে মানসিক চাপে ছিলেন আফরোজা। তাকে অনেক ডাক্তার ও কবিরাজ দেখানো হয়েছে। কিন্তু কেউই বুঝতে পারেননি তিনি কী ভয়ংকর এক মানসিক যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন বা এমন ভয়ংকর কিছু করবেন।

আফরোজা মূলত ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’ নামের অদৃশ্য এক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়ছিলেন। এই মানসিক অবসাদ অনেক মায়ের ভেতরে জন্মের পর থেকে নিঃশব্দে বাসা বাঁধে। একাকিত্ব, ভয়, অপরাধবোধ এসব মিশে তাদের জীবন করে তোলে অসহনীয়।

চিকিৎসকরা বলেন, সন্তান জন্মের পর প্রায় ৭০ শতাংশ নারী কোনো না কোনো পর্যায়ে মানসিক চাপ বা হতাশায় ভোগেন। কিন্তু সচেতনতা ও সহমর্মিতার অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা অজানাই থেকে যায়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কোনো দুর্বলতা নয়।এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক অবস্থা। পরিবার যদি সময়মতো পরিবর্তনগুলো বুঝে, সহানুভূতিশীল আচরণ করে, এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নেয় তাহলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অথচ বাংলাদেশে ‘মাতৃত্ব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য’ নিয়ে আলাপ এখনো ট্যাবু। সন্তান জন্মের পর মায়ের মানসিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বরং “মাথার সমস্যা” ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ এটি চিকিৎসাযোগ্য, বুঝতে পারলে বাঁচানো যায় অনেক জীবন।

মাত্র আড়াই বছরের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আফরোজার শেষ যাত্রা যেন এক করুণ চিঠি সমাজের প্রতি। যা হয়তো কয়েকদিন খবরের কাগজে থাকবে। কিন্তু যদি তার মৃত্যুর কারণ আমাদের চোখ খুলে দেয়, আমরা যদিপরের আফরোজাকে সময়মতো শুনি তবেই এই নীরব চিৎকার অর্থবহ হবে।

লেখক: রিমু সিদ্দিক
নারী, শিশু উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.